ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬ , ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

​ভুয়া মামলার ফাঁদ: টার্গেট দেড় কোটি, না দিলে ‘গণহত্যা’র আসামি!

আদালতকে হাতিয়ার বানিয়ে ব্ল্যাকমেইলিং

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৮-০৪ ১৬:৫৩:৫৭
আদালতকে হাতিয়ার বানিয়ে ব্ল্যাকমেইলিং আদালতকে হাতিয়ার বানিয়ে ব্ল্যাকমেইলিং


​বিশেষ প্রতিবেদক
বয়স ৭২ ছুঁয়েছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও দেশের অবহেলিত ও অসহায় মানুষের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেওয়াই যাঁর ব্রত-সেই প্রবীণ সমাজসেবক মোঃ নূরুল হকই এবার পড়েছেন এক সংঘবদ্ধ ব্ল্যাকমেইলার চক্রের কবলে। সুপ্রিম কোর্টে দেশের প্রায় ৪৫ হাজার ৮১০ জন গ্রাম পুলিশের বঞ্চনার আইনি লড়াই যিনি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পরিচালনা করছেন, তাঁর বিরুদ্ধেই পরিকল্পিতভাবে দায়ের করা হয়েছে ভিত্তিহীন মামলা।

​# প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই ভুয়া ঠিকানার মামলা গ্রহণ, প্রশ্নবিদ্ধ আইনি প্রক্রিয়া
# ভিসা প্রতারক চক্রের শিকারে ৭২ বছরের সমাজসেবক নূরুল হক
# বিদেশি নম্বর থেকে ছেলেকে হত্যার হুমকি, দৌলতপুর থানায় জিডি

​তবে চক্রটি কেবল মামলা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। আদালতকে চাঁদাবাজির ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ভুয়া ঠিকানার বাদী ও তাঁর সহযোগীরা নূরুল হকের ছেলের কাছে দাবি করেছে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। চাঁদা না দিলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ‘গণহত্যা’ মামলায় জড়ানোর পাশাপাশি দেওয়া হচ্ছে সপরিবারে হত্যার হুমকি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১২ জুলাই ২০২৬ তারিখে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে মোঃ নূরুল হকের বিরুদ্ধে একটি সি.আর. মামলা (নম্বর-৫৮১/২০২৬) দায়ের করা হয়। মামলাটি বিচারক মাহবুব আলমের ৯ নম্বর আদালতে উপস্থাপিত হলে, কোনো ধরনের প্রাথমিক তদন্ত বা পুলিশি প্রতিবেদন ছাড়াই তা গ্রহণ করে আদেশ দেওয়া হয়।

​মামলার বাদী সৈয়দা শিনিয়াত নূরী। তিনি তাঁর পিতা সৈয়দ আব্দুল কাদের জিলানী ও স্বামী মহীদুদ্দীন আহমেদের নাম উল্লেখ করে আরজিতে ধানমন্ডির একটি বাসার ঠিকানা ব্যবহার করেছেন। 

কিন্তু সরেজমিন অনুসন্ধানে, ওই ঠিকানায় বাদীর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ওই ভবনের কেয়ারটেকার ও স্থানীয়রা জানান, “এই নামে কোনো নারী বা পরিবার এখানে কখনো ভাড়ায় বা ফ্ল্যাট কিনে থাকেননি। ঠিকানাটি পুরোপুরি ভুয়া।

​ভুয়া ঠিকানায় দায়ের করা মামলা প্রাথমিক তদন্ত ছাড়া গ্রহণ করায় পুরো বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজ্ঞরা। সুপ্রিম কোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, “সি.আর. মামলার ক্ষেত্রে বাদীর পরিচয় ও সত্যতা যাচাই বা পিবিআই/পুলিশকে দিয়ে প্রাথমিক তদন্ত করানোটা সাধারণ নিয়ম। এটি না করে সরাসরি আদেশ দেওয়া হলে তা বিচারিক হয়রানির জন্ম দেয়, যা এই প্রবীণ সমাজসেবকের ক্ষেত্রে ঘটেছে।

ভুক্তভোগী নূরুল হকের অভিযোগ, মামলাটি দায়েরের পরপরই শুরু হয় আসল ব্ল্যাকমেইলিং। বাদীর সঙ্গে যুক্ত প্রতারক চক্রটি যুক্তরাজ্যের লন্ডনে সাংবাদিকতায় কর্মরত নূরুল হকের ছোট ছেলের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে মামলার কপির ছবি পাঠায়। এরপরই সরাসরি ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।

​টাকা না দিলে নূরুল হককে বৈষম্যবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের সময়ের বিভিন্ন ‘গণহত্যা’ বা হত্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়।

হুমকির মাত্রা এখানেই থেমে থাকেনি। জিডির তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ এপ্রিল ২০২৬ সকাল ৮টার দিকে কুষ্টিয়ার নিজ বাড়িতে অবস্থানকালে নূরুল হকের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একটি বিদেশি নম্বর (+৬৬৮২৯৯০৪৩২৩) থেকে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা আসে। ওই বার্তায় নূরুল হকের ছেলেকে যেকোনো সময় খুন করা এবং পুরো পরিবার ধ্বংস করে দেওয়ার সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়।

নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে মোঃ নূরুল হক কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নম্বর-১২৯৬, তারিখ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬) করেছেন। এ বিষয়ে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, “আমরা জিডিটি গ্রহণ করেছি। সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সহায়তায় বিদেশি নম্বরটির আইপি ট্র্যাক করে হুমকিদাতাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। 

​নেপথ্যে ইমিগ্রেশন ও ভিসা প্রতারক সিন্ডিকেট
অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। মামলার বাদী সৈয়দা শিনিয়াত নূরী এবং মামলায় উল্লেখিত একাধিক সাক্ষী দীর্ঘদিন ধরে একটি অবৈধ ইমিগ্রেশন ও ভিসা কনসালটেন্সি চক্রের সঙ্গে জড়িত। মামলার অন্যতম সাক্ষী সৈয়দা সেরা মাহজাবিন যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকা অবস্থায় নানা অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গত ৩ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে চাকরিচ্যুত হন।

এই চক্রের বিরুদ্ধে ভিসার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, হুমকি ও চাঁদাবাজির একাধিক খবর এর আগে দৈনিক ইনকিলাবসহ বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। চক্রটি এবার তাদের চাঁদাবাজির হাতিয়ার হিসেবে আদালতকে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

​এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মামলার বাদী সৈয়দা শিনিয়াত নূরী ও সাক্ষী সেরা মাহজাবিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। তাদের দেওয়া ঠিকানাও ভুয়া হওয়ায় সরাসরি বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

​সম্ভ্রান্ত পরিবার ও নিঃস্বার্থ সমাজসেবা
নূরুল হক সামাজিকভাবে অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ও সুপরিচিত পরিবারের সন্তান।
তাঁর ছোট ভাই ড. একরাম-উল-আজীম কানাডার একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী। দীর্ঘ সময় ধরে নূরুল হক ‘বাংলাদেশ রাইট্স ফর পিপল’-এর চেয়ারম্যান হিসেবে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের আইনি লড়াই চালিয়ে আসছেন। নিজে কখনো কোনো ভিসা বা কনসালটেন্সি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত না থাকলেও সম্পূর্ণ অপরিচিত এক চক্র ভুয়া অভিযোগ তুলে তাঁর মতো একজন সম্মানিত মানুষকে হয়রানি করছে।


​প্রবীণ এই সমাজসেবকের দাবি, প্রকৃত অপরাধী ও প্রতারক চক্রটি অর্থ আদায়ের অসৎ উদ্দেশ্যে তাঁর সুনাম ক্ষুণ্ণ করছে। ষড়যন্ত্রমূলক এই মামলার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু বিচার বিভাগীয় তদন্ত, ভুয়া ঠিকানার বাদীর প্রকৃত পরিচয় উদঘাটন এবং প্রাণনাশের হুমকিতে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে তিনি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।

 

নিউজটি আপডেট করেছেন : Banglar Alo News Admin

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ